ইসলামের দৃষ্টিতে হিংসার আগুন ও বিদ্বেষের ব্যাধি
Posted on May 06, 2026 10.6K
হিংসুক ও বিদ্বেষী মানুষ কোনো অবস্থায় স্বস্তি খুঁজে পায় না। তার কোনো সত্বন্ধু জোটে না। তার মনে সব সময় হতাশা কাজ করে। হৃদয় থাকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মতো।
যেখান থেকে সর্বদা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র, ধোঁকা ও মিথ্যাচারের স্ফুলিঙ্গ বের হয়। সে সর্বদা নিজেকে বিজয়ী ভাবে। অথচ সে-ই সবচেয়ে পরাজিত। সে নিজেকে বীর ভাবে, অথচ সে-ই সবচেয়ে ভীরু।
হিংসা কাকে বলে : হিংসা মানে মহান আল্লাহ অন্যকে যে নিয়ামত দান করেছেন তার বিনাশ কামনা করা এবং নিজে তা না পেয়ে ব্যথা অনুভব করা। হিংসার পেছনে পেছনে আসে বিদ্বেষ। সে তখন সর্বদা ওই ব্যক্তির মন্দ কামনা করে। যেমন—মুমিনদের বিরুদ্ধে মুনাফিকদের আচরণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমাদের কোনো কল্যাণ স্পর্শ করে, তাতে তারা অসন্তুষ্ট হয়।
আর যদি তোমাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তাতে তারা আনন্দিত হয়।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১২০)
কিছু মানুষের মনে হিংসা মজ্জাগত ও অনেকটা স্বভাবগত। সবখানে তারা নিজেদের হকদার মনে করে, আর নিজেদের নিগৃহীত আবিষ্কার করে। অথচ আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের প্রতি তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। নিয়ামতের শুকরিয়া নেই।
এমন লোকের ক্ষতি থেকে বাঁচতে প্রতিদিন আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে হবে সুরা ফালাক ও নাস পড়ে। পবিত্র কোরআনে এসেছে : ‘এবং (আমি আশ্রয় চাই) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।’ (সুরা : ফালাক, আয়াত : ৫)
হিংসার আগুনে পুড়ে ছারখার : হিংসা-বিদ্বেষ অন্যকে হত্যা করার আগে নিজেকে হত্যা করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘...বলে দাও, ‘তোমরা তোমাদের রাগ নিয়ে মরো!’ নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।’’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১১৯)
মহান আল্লাহ মানুষকে মেধায়, শক্তিতে, সম্পদে ও মর্যাদায় পরস্পরে উঁচু-নিচু করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। তাই মুসলমানের কর্তব্য হলো অন্যের কল্যাণকামী হওয়া। অন্তরে কারো প্রতি হিংসার কালিমা না রাখা। যদি কখনো সেটা এসেই যায়, তাহলে বুদবুদের মতো যেন তা উবে যায়। কচুপাতার পানির মতো যেন তা ঝরে যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না, একে অন্যের পেছনে লেগে থেকো না, একে অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ কোরো না; বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও, পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৩৫)
আত্মচিন্তায় বিভোর শকুনের কামনা যেমন গরুর মৃত্যু ডেকে আনে না, তেমনি হিংসুকের হিংসাও কারো নিয়ামত ছিনিয়ে নিতে পারে না। হিংসাকে অগ্রাহ্য করে প্রতিনিয়ত যখন কেউ এগিয়ে চলে তখন বাড়তে থাকে হিংসার আগুন। সে আগুনে জ্বলে-পুড়ে ছাই হতে থাকে হিংসুক নিজেই। পুড়ে ছারখার হয় তার আমলও। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থেকো। কারণ হিংসা নেক আমল গ্রাস করে নেয়, যেভাবে আগুন গ্রাস করে লাকড়ি (অথবা ঘাস)।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯০৫)
স্বার্থে আঘাত ও অতি লোভ মানুষকে হিংসুক করে তোলে : স্বার্থে আঘাত লাগলে এবং কখনো অতি লোভে মানুষ হিংসুক হয়ে উঠে। যেমন : (ক) সৃষ্টির সূচনায় শয়তান আদম (আ.)-এর উচ্চ সম্মান দেখে হিংসায় জ্বলে উঠেছিল। তাকে আদম (আ.)-এর প্রতি সম্মানের সিজদা করতে বলা হলে সে অস্বীকার করে। কুযুক্তি দিয়ে বলে—‘আমি আগুনের তৈরি আর আদম মাটির তৈরি। অতএব, আগুন কখনো মাটিকে সিজদা করতে পারে না।’ এভাবে সে হিংসা ও অহমিকা প্রদর্শন করে আল্লাহর হুকুম মানতে অস্বীকার করে। ফলে জান্নাত থেকে চিরকালের জন্য বিতাড়িত হয়।
(খ) অনুরূপভাবে আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে হিংসাবশে—কাঙ্ক্ষিত নারীকে না পেয়ে।
(গ) ইহুদিরা ভেবেছিল, শেষ নবীর আগমন হবে তাদের বংশ থেকে। কিন্তু সেটা না হওয়ায় তারা খেপেছিল। নবীজিকে নিয়ে তারা হিংসা করেছিল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আহলে কিতাবের মধ্যে বহু লোক চায় তোমাদের ঈমান আনার পরে কুফরিতে ফিরিয়ে নিতে, তাদের কাছে সত্য প্রকাশিত হওয়ার পরও—শুধু বিদ্বেষবশত।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১০৯)
(ঘ) আবু জাহল শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে সত্য বলে স্বীকার করেও মেনে নেয়নি নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে। মহানবী (সা.) বনু মখজুম (আবু জাহলের গোত্র) গোত্রে জন্মগ্রহণ না করে বনু হাশেম গোত্রে জন্মগ্রহণ করার কারণে সে হিংসার আগুনে পুড়ে মরে।
(ঙ) নবী ইউসুফ (আ.) ভাইদের হিংসার শিকার হন। বাল্যকালে ইউসুফ (আ.)-এর দেখা স্বপ্নবৃত্তান্ত শোনার পর পিতা তার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং অজানা আশঙ্কায় তাকে সর্বক্ষণ চোখের ওপর রাখতেন। ফলে বিমাতা ভাইয়েরা তার প্রতি হিংসায় জ্বলে ওঠে এবং শিশু ইউসুফকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে সুরা ইউসুফ নাজিল হয়।
হিংসুক থেকে বাঁচার পথ : প্রথমত, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা, কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো বেশি বেশি পড়া। সুরা ফালাক ও নাসের আমলের পাশাপাশি কোরআনে বর্ণিত এই দোয়াও পড়া যায় : ‘হে আমাদের রব! আমাদের ও আমাদের সেসব ভাইকে তুমি ক্ষমা করো। যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর তুমি আমাদের অন্তরে মুমিনদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বিদ্বেষ সঞ্চার কোরো না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই তুমি স্নেহশীল ও দয়াবান।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১০)
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা থাকলে প্রতিরোধ করা। যেমন—রাসুল (সা.) মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং অবশেষে তাদের মদিনা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।
তৃতীয়ত, সত্য প্রকাশ করে দেওয়া এবং হিংসুক ব্যক্তি বা দলকে এড়িয়ে চলা ও তাদের শাস্তির বিষয়টি আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। যেমন—মহান আল্লাহ হিংসুক ইহুদিদের সম্পর্কে বলেন, ‘তোমরা তাদের ক্ষমা করো ও উপেক্ষা করে চলো, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর (চূড়ান্ত) নির্দেশ দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে ক্ষমতাবান।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১০৯)
