নির্বাচন ঘিরে বিএনপি-জামায়াতের হিসাবনিকাশ
Posted on January 04, 2026 10.2K
সদ্য বিদায়ি ইংরেজি বছরের ডিসেম্বর মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস ছাড়াও ২০২৫ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তিনটি নজিরবিহীন ঘটনা। আঁততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত তরুণ রাজনৈতিক নেতা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র অনলবর্ষী বক্তা শরিফ ওসমান হাদি গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করার পর ২০ ডিসেম্বর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জনতার বিপুল উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাজা।
দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে কাটানো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রদান এবং পূর্বাচলের ৩০০ ফিট রাস্তার ওপর স্মরণকালের বৃহত্তম জনসমাবেশে তাঁর বক্তব্য এবং বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জনসমাগমের দিক থেকে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠান এবং শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন।
এক মাসে এতগুলো বড় ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। এই ঘটনাপ্রবাহ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের গুরুত্ববহ ডিসেম্বর মাসের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধির সঙ্গে অনেকটা নীরবেই জাতীয় রাজনীতির হিসাবনিকাশে অনেক পরিবর্তনও এনেছে। আর মাত্র এক মাস সাত দিন পর অনুষ্ঠেয় বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত দেশে যে রাজনৈতিক চিত্র বিরাজ করছিল, তা সহসাই পাল্টে গেছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এখন বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী হিসেবে মুখ্য দল আছে দুটি-বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। অন্যান্য দলের মধ্যে জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছাড়া জাতীয়ভাবে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী আর কোনো দল এ মুহূর্তে নেই। বিভিন্ন ইসলামি দল দেশজুড়ে তাদের ‘বিপুল’ জনসমর্থনের দাবি করলেও জনগণের কাছে তারা কখনো তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। অন্য ছোট ছোট দলের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া অন্য দলগুলো একান্তই পীর ও ব্যক্তিনির্ভর। একমাত্র ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া প্রায় প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে ইসলামি দলের অংশগ্রহণে আধিক্য দেখা গেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলামি দলগুলোর অংশগ্রহণ সম্ভবত অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীসংখ্যাও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে এবার নিবন্ধিত হয়েছে ৫১টি দল। তাদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ অন্যান্য দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ২ হাজার ৫৬৯টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র যাচাইবাছাই শুরু করেছে, যা আজ ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। মনোনয়নপত্রে বিভিন্ন ত্রুটি ও তথ্যের অপর্যাপ্ততার কারণে বাছাইপর্বের প্রথম দুই দিনেই কমিশন ৭৫টি মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন হেভিওয়েট প্রার্থী ডাকসুর সাবেক ভিপি ও নাগরিক ঐক্যের নেতা মাহমুদুর রহমান (বগুড়া-২) এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদের (কক্সবাজার-২) মনোনয়ন বাতিল করেছে। ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত আরও কিছু মনোনয়নপত্র বাতিল হবে। আপিলের সুযোগ থাকায় বাতিল হওয়া কিছু মনোনয়নপত্র বৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে সে সংখ্যা খুব বেশি হবে না। ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার এবং নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার পরই নির্বাচনি প্রচারণা গতি লাভ করবে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সারা দেশে বিএনপির পক্ষে জনসমর্থনের যে জোয়ার পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি যে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে ধারণা করা যায়
নির্বাচন কমিশনের বরাত দিয়ে সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মোট ৩৩১ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২৭৬ জন, জাতীয় পার্টির ২২৪ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৬৮ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির ৪৪ জন, সিপিবির ৬৫ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৪১ জন, জাসদের ৯ জন, জেএসডির ৩১ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৯৪ জন, খেলাফত মজলিসের ৬৮ জন, গণঅধিকার পরিষদের ১০৪ জন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির ৫৩ জন, গণফোরামের ২৩ জন, গণসংহতি আন্দোলনের ১৮ জন, নাগরিক ঐক্যের ১১ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ১১ জন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের ৫ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
বিলম্বিত নির্বাচনের কারণে একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সরকারের যে ভাবমূর্তি ছিল, জনগণ সরকারের ওপর যে আস্থা রেখেছিল, এমনকি নির্বাচন না দিয়ে তাঁকে পাঁচ বছর পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের জন্য জনগণের পক্ষ থেকে আওয়াজ তোলা হয়েছিল, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতার কারণে এখন তাঁর ও তাঁর সরকারের শুরুর দিকের জনপ্রিয়তা এবং উজ্জ্বল ও ভাবমূর্তির ছিটেফোঁটাও আর অক্ষুণ্ন নেই। জনগণ এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছে যে তারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে শিগগিরই অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় কামনা করছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিলম্বের কারণে রাজনৈতিক সমীকরণেও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রধান দুটি দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পরস্পরের কাছ থেকে এত দূরে চলে গেছে যে অতীতে জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন, মন্ত্রিপরিষদে জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করা ও রাজপথের আন্দোলনে জামায়াতকে বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী মিত্র হিসেবে সঙ্গে রাখলেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে কিছু কিছু বিএনপি নেতা তাঁদের বক্তব্যে জামায়াতকে আওয়ামী লীগের ভাষায় আক্রমণ করতে শুরু করেন। এর পেছনে আওয়ামী লীগের কায়দায় এককভাবে ক্ষমতাসীন হওয়ার মোহ কাজ করে থাকতে পারে। এমনকি বিএনপির অনেক নেতা ক্ষমতাসীন হওয়ার ঐশী প্রত্যাদেশ লাভের মতো আচরণ শুরু করেন। তাঁরা জুলাই বিপ্লবের আকস্মিক সুবিধাভোগী হওয়া সত্ত্বেও জুলাই বিপ্লবের নেতাদের সংগঠন এনসিপির প্রস্তাব অনুযায়ী দলমতনির্বিশেষে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেও এনসিপি ইতিবাচক সাড়া পায়নি। চব্বিশের জুলাইয়ের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বক্তৃতায় জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলতে শুরু করেছিলেন। জামায়াতে ইসলামী এখন পর্যন্ত বিএনপিকে সঙ্গে রেখে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে। কিন্তু তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সারা দেশে বিএনপির পক্ষে জনসমর্থনের যে জোয়ার পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি যে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে ধারণা করা যায়। জন্মলগ্ন থেকে জটিল রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে নাকানিচুবানি খাওয়া জনগণ তাদের অভিজ্ঞতা থেকেই জানে যে বাংলাদেশের নির্বাচনে এককভাবে বিজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে এমন রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকরা জাতীয় সরকার গঠনের কথা ভাববেন না। অতএব নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জাতীয় সরকার গঠিত হবে না, তা মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। তা ছাড়া দেশ এখন যুদ্ধাবস্থায় নেই অথবা সরকারের একক প্রচেষ্টায় সমাধান করা সম্ভব নয়, এমন কোনো সংকটের মধ্যেও নেই। সময়ের দাবি ছিল দেশ ও জাতির কাঁধে চেপে বসা ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা, যা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ কোনো সহযোগিতা ছাড়াই ছাত্র ও তরুণ সমাজ সম্ভব করেছে। তারা সব মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য নোবেল বিজয়ী বিশ্বব্যাপী পরিচিত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করায় তিনি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। গত প্রায় দেড় বছর তাঁর
জাতীয় সরকার গঠনের দাবি কারা তোলে? ছোট দলগুলো, যাদের পক্ষে কখনো এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব নয়। জুলাই বিপ্লবের পর নেতৃত্বশূন্য বিএনপির দুরবস্থার কারণে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে এমন এক আস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে পরবর্তী নির্বাচনে তারাই সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। এর কারণও ছিল, বিপ্লবের পর কয়েক দিন রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা বিরাজ করলেও পরিস্থিতির ফায়দা লুটতে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে একদল লোক আওয়ামী লীগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সদ্য জুলুমমুক্ত জনগণ বিএনপির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। তারা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে এই মর্মে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকে যে তারা ৫৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, এবার তারা নতুন কিছু দেখতে চায়।
তাদের এই বিকল্প জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ সরকারের তিনটি মেয়াদে জামায়াতের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীর ওপর কীভাবে জুলুম চালানো হয়েছে, প্রহসনের বিচারে কীভাবে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হয়েছে, জনগণ তা প্রত্যক্ষ করে জামায়াতের প্রতি দুর্বলতা ও সহানুভূতি অনুভব করেছে। জামায়াতের প্রতি জনসমর্থনও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সন্দেহ নেই যে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারা অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে বেশি আসন লাভ করবে, কিন্তু তাদের প্রাপ্ত আসনসংখ্যা কোনো অবস্থাতেই সরকার গঠন করার মতো হবে না।
এমনকি জামায়াতকেন্দ্রিক সম্ভাব্য জোটে যারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, তারাও এমন সংখ্যক আসন লাভ করতে পারবে না, যা তাদের জামায়াতের নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার গঠনের সুযোগ এনে দেবে। দৈবচক্রে যদি এমন কিছু ঘটেও যায়, ইসলামি দলগুলোর চিরাচরিত অন্তঃকলহ অনুরূপ ধরনের কোয়ালিশন সরকারকে ক্ষণস্থায়ী করবে এবং দেশ আরেকটি বিপর্যয়ের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে, যা কেউ আশা করে না।
