Latest News

বিপর্যয়ের মুখে বিশ্ববাণিজ্য

Posted on March 04, 2026   7.9K

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিবাদে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম জলপথ হরমুজ প্রণালি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধের কথা জানিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে কেউ এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ওই পথে জাহাজ চালালে তাতে হামলা করা হবে। এদিকে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের কারণে গত কয়েক দিনে এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের আকাশপথও প্রায় বন্ধের পথে। কয়েক দিনে ৫ শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী। আকাশপথে ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহনও। বিশ্বের তেল উৎপাদানকারী কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি অন্তত ২০ ডলার করে তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বড় বড় শেয়ারবাজারের প্রতিটিতে কয়েক দিন ধরে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এসব শেয়ারবাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে গতকাল ব্যাপক ধস নেমেছে। যুক্তরাজ্যের শেয়ারবাজারে যে পতন নেমেছে, সেটা এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ধস।


যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের অবস্থাও একই রকম। জাপানের শেয়ারবাজারে কয়েক দিনে ৭ শতাংশের বেশি পতন হয়েছে। তবে ব্যতিক্রম ঘটেছে শুধু চীনা শেয়ারবাজারে। দেশটির শেয়ারবাজারের প্রধান প্রধান সূচক গতকালও ছিল ইতিবাচক ধারায়। এ ছাড়া এ যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে গম, ভুট্টা ও সয়াবিন তেলের দামে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা দিয়েছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে খাদ্যের সরবরাহ চেন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে। যার কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। কোথাও কোথাও খাদ্যের মজুতে প্রকট সংকট দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতম অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। এখানকার সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি হলে দক্ষিণ এশিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চলেও এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ যদিও সরাসরি এ যুদ্ধের অংশ নয়, তবু অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বেশ কিছু ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাবও পড়তে পারে দীর্ঘমেয়াদি। প্রত্যক্ষ প্রভাবের চেয়ে যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে আরও বেশি। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এ যুদ্ধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রাফিউদ্দীন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ইরান যদি আর এক সপ্তাহ টিকে যায় তাহলে উল্টো যুক্তরাষ্ট্র বিপদে পড়তে পারে। তখন মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে ভাবতে হবে ইরানকে নিয়ে। এ যুদ্ধে অর্থনৈতিক অবস্থা এতই নাজুক হতে পারে যা আমাদের মতো গরিব দেশ এর ভার বইতে পারবে না। এতে বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়তে পারে। তেলসহ সবকিছুর দাম হুহু করে বাড়বে। করোনার সময়ের চেয়ে ভয়াবহতা কম হবে না। যা স্থায়ী হবে হয়তো আগামী কয়েক বছর। টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। বিমান ভাড়া থেকে শুরু করে দেশ চালানোর ব্যয় অনেক অনেক গুণ বেড়ে যাবে।’


অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর এর আঘাত আসবে বলে মনে করেন এ খাতের সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিশ্ববাণিজ্য। দেশের ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে। এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের চলমান অর্থনৈতিক মন্দা আরও ঘনীভূত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনার সময় বিশ্ব অর্থনীতি যে ধাক্কা খেয়েছিল, তার চেয়েও বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে এবার, যদি যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত হয়। বিএকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সাত মাস ধওে পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। আসছে জুনের পর আমরা এ নেতিবাচক ধারা কেটে ওঠার প্রত্যাশা করেছিলাম কিন্তু ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেটা না-ও হতে পারে।’ এ ছাড়া সামনে এই পতনের ধারা আরও ত্বরান্বিত করবে এ যুদ্ধ পরিস্থিতি বলে তিনি মনে করেন।


বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইসরায়েলের মতো উন্নত না হওয়ায় ইরান তাদেরকে সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাঁরা বলছেন, এ অঞ্চলের প্রধান তেল শোধনাগারগুলোতে ইরানের হামলার কারণে সংকটে থাকা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমস্যা যোগ হয়েছে। তা মূলত এ অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিকে আঘাত করছে। গত পরশু ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব তাদের বৃহত্তম তেল শোধনাগার বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি আরামকোর রাস তানুরা রিফাইনারি নামের ওই শোধনাগারের উৎপাদনক্ষমতা প্রতিদিন সাড়ে ৫ লাখ ব্যারেল।


কাতারও গতকাল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করেছে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জির একটি স্থাপনায় ইরানের ছোড়া দুটি ড্রোন আঘাত হানার পর এ পদক্ষেপ নেয় দেশটি। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ আসে কাতার থেকে।


উপসাগরীয় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক। এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে এলএনজি চাহিদায় ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে কাতারের। তাদের গ্রাহকের ৮২ শতাংশই এশিয়ার।


এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে হামলা ও ইরানের পাল্টা হামলায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশিদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের কর্মসংস্থান। পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহ। প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রায় ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করেন। সেখান থেকে আসে দেশের মোট রেমিট্যান্সের ৪৯ শতাংশ। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে ইরান। দেশগুলোয় প্রায় ৪০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত। এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Share on

Tags

(0) Comments

  • Nothing Found!

Add Comment