ইংরেজি নামে বাংলা ছবি নির্মাণ থামছে না
Posted on April 22, 2026 11.6K
পৃথিবীতে ভাষার জন্য অকাতরে জীবন দেওয়ার দৃষ্টান্ত একমাত্র বাঙালি জাতিরই রয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অঙ্গনে সরব হয়েছে। তারপরও ভিনদেশি ভাষা শুধু নয়, সংস্কৃতিও অবাধে আমরা অনুকরণ আর অনুসরণ করে যাচ্ছি। এর অর্থ হলো ভাষার জন্য জীবন দানকে আমরা ভুলে যাচ্ছি আর অর্থহীন করে তুলছি। চলচ্চিত্র হচ্ছে একটি দেশের প্রধান গণমাধ্যম। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দেশের মানুষ নিজ দেশ, ভাষা, জীবন আর কৃষ্টি কালচারের সন্ধান পায়। এই চলচ্চিত্রের কাঁধেও চেপেছে ভিনদেশি ভাষার ভূত। মূলত আশির দশক থেকেই অহেতুক বাংলা ছবির নাম ইংরেজিতে রাখার প্রবণতা শুরু হয়। যা একটি জাতির স্বাতন্ত্র্যবোধ রক্ষার ক্ষেত্রে সত্যিই অন্তরায় এবং দুঃখজনক। এ অনিয়ম রোধের জন্য সর্বপ্রথম বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার ‘শোবিজ বিভাগ’ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। ২০১৪ সালের ৭ মার্চ বিষয়টি নিয়ে শোবিজ বিভাগে ‘ইংরেজি নামে অবাধে ছবি নির্মাণ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর ওই বছরের আগস্ট মাসেই সরকার বাংলা ছবির ইংরেজি নাম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তৎকালীন তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল- ‘সাম্প্রতিককালে অনাবশ্যকভাবে বাংলা সিনেমার নাম ইংরেজীকরণের প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আলাউদ্দীন মাজিদঢালাওভাবে বাংলা চলচ্চিত্রের ইংরেজি নামকরণ বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এসব বিষয় বিবেচনা করে চলচ্চিত্রের নামের ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অনুসরণ নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই প্রজ্ঞাপনটি চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক সমিতি ও সেন্সর বোর্ডের কাছে প্রেরণ করা হয়। এ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ২০১৪ সালের আগস্টের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইংরেজি নামে বাংলা ছবি নির্মাণ ও মুক্তি অব্যাহত রয়েছে। মানে সরকারি আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে একশ্রেণির নির্মাতা ভিনদেশ প্রীতি দেখিয়ে চলেছে। ২০১৪ সালে আইন জারির পর থেকে এখন পর্যন্ত যেসব ছবি ইংরেজি নামকরণে নির্মিত হয়েছে এবং হচ্ছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- গেইম রিটার্নস, বিগ ব্রাদার, অ্যাকশন জেসমিন, ইউটার্ন, ব্লাকমানি, লাভম্যারেজ, লাভার নম্বর ওয়ান, দ্য স্টোরি অব সামারা, গ্যাংস্টার রিটার্ন, হেড মাস্টার, লাভ স্টেশন, সুইটহার্ট, মিসড কল, ব্ল্যাকমেইল, ওয়ার্নিং, রানআউট, আন্ডার কনস্ট্রাকশন, হিটম্যান, মাই নেম ইজ সিমি, ঢাকা অ্যাটাক, মিশন এক্সট্রিম, সুপার হিরো, মেড ইন বাংলাদেশ, বিট কয়েন স্কিম, জ্যাম, পাসওয়ার্ড, ক্যাপ্টেন খান, ফিফটি ফিফটি লাভ, মিস্টার বাংলাদেশ, লিডার, আই অ্যাম রাজ, বয়ফ্রেন্ড, লাইভ ফ্রম ঢাকা, দ্য ডিরেক্টর, কমান্ডো, ডু অর ডাই, নো ল্যান্ডস ম্যান, মাফিয়া পার্ট-১, লকডাউন লাভস্টোরি, ও মাই লাভ, ব্ল্যাক ওয়ার, মিশন এক্সট্রিম টু, অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন, কিল হিম, ক্যাসিনো, ট্রাপ দ্য আনটোল্ড স্টোরি, গ্রিনকার্ড, ডেডবডি, ডার্ক ওয়ার্ল্ড, রিভেঞ্জ, মোস্ট ওয়েলকাম, মেকাপ, প্রিন্স, প্রেসার কুকার প্রভৃতি।
আলাউদ্দীন মাজিদদুঃখের বিষয় হলো সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড ইংরেজি নামে নির্মিত বাংলাদেশি ছবিকে অবলীলায় ছাড়পত্র দিয়ে যাচ্ছে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন, ‘এটি জাতি হিসেবে আমাদের দৈন্য ও চরম ব্যর্থতা। সেন্সর নীতিমালায় এ বিষয়ে কঠোর আইন থাকা উচিত ছিল। ২০১৪ সালে সরকারি এক প্রজ্ঞাপনে বাংলা ছবির ইংরেজি নামকরণ নিষিদ্ধ করা হয়। এ নিষেধাজ্ঞা নির্মাতা বা সেন্সর বোর্ড মানছে না। এটি দুঃখজনক।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য, সরকারি প্রজ্ঞাপনে ইংরেজি নামকরণকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তারপরও অনাবশ্যকভাবে ইংরেজি নামকরণ সমর্থনযোগ্য নয়। এ প্রবণতা যদি বেড়ে যায় তাহলে বোর্ডের যে কমিটি আছে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে পারে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, প্রজ্ঞাপনটিতে এমন কোনো ক্লজ রয়েছে যার ফাঁকফোকরে ইংরেজি নামকরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ও সেন্সর বোর্ডের সাবেক সদস্য ইফতেখার নওশাদ বলেন, ছবির গল্পের সঙ্গে না গেলে অহেতুক ইংরেজি নামকরণ সমর্থন করি না। কিছু ইংরেজি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়। এ বিষয়ে এফডিসির ভূমিকা প্রধান। তারা অহেতুক ইংরেজি নামে ছবি এন্ট্রি না করলেই হয়। খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা মতিন রহমান বলেন, সেন্সর বোর্ড নীতিমালার এসআরও ১৯৮৫-এর ধারা ১-এর উপধারা ‘এ’-তে বর্ণিত আছে- ‘বাংলাদেশ বা এর জনগণের সমসাময়িক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রথা ও পোশাকের পরিপন্থি কোনো বিষয় চলচ্চিত্রে থাকতে পারবে না। এই নির্মাতার প্রশ্ন, ভাষাগতভাবে ছবির নামের দিকটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাধ্যবাধকতার বিষয়টি সেন্সর বোর্ডের আইনে কেন উল্লেখ নেই?’ এই নীতিমালার দুর্বলতার সুযোগে অসাধু নির্মাতারা বাংলাদেশি ছবির নাম ইংরেজিতে রাখার দুঃসাহস দেখিয়ে যাচ্ছে। এটি প্রতিরোধ করা জরুরি। সেন্সর বোর্ড এ বিষয়ে কঠোর হবে বলে আশা করছি।
