বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সামনে কেমন হবে?

Posted on April 06, 2026   10.5K

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারত সফরে যাচ্ছেন। বিএনপি সরকার গঠিত হবার পর, এটিই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর। নানা কারণে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য এটি হতে পারে নব যাত্রার সূচনা। যেকোনো দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি। আমরা সবকিছু পাল্টাতে পারি, কিন্তু প্রতিবেশী পাল্টাতে পারি না। প্রতিবেশীর সাথে বিরোধ করে লাভের চেয়ে নিজেদের ক্ষতিই হয় বেশি।


কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের মত ছোট এবং উন্নয়নের জন্য সংগ্রামরত দেশগুলোর জন্য সকলের সাথেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। এখন এই বিশ্বায়নের যুগে কোন রাষ্ট্রই একলা চলতে পারে না। বাংলাদেশের জন্য তা আরও কঠিন। একারণেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হলো ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা না’। কিন্তু ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশ বিশ্বে একলা হয়ে যায়। ড. ইউনূস দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, বিশ্ব আমাদের কাছে আসবে। কিন্তু বাস্তবে বিশ্ব আমাদের কাছে আসেনি। বিশ্বে বাংলাদেশ একটি অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।


ক্ষমতা নেওয়ার শুরুতে মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও, বাস্তবে তার করা কোনো গোল আমরা উদ্‌যাপন করতে পারিনি। পাকিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য নেই।  ড. ইউনূস বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা রোজার ঈদ করবেন মিয়ানমারে, কার্যত সেটা হয়নি। উল্টো এর মধ্যে অন্তত লাখ দুয়েক রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। ৭০ হাজার সৌদি প্রবাসী রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পাসপোর্ট পাচ্ছে। আরাকান আর্মির গুলিতে আমাদের এক মেয়ের মাথার খুলি উড়ে গেছে।


ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারেননি, বরং কথার কারণে সম্পর্কটাকে বিষিয়ে তুলেছেন। এই দেড় বছরে একটা দেশেরও ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে ঢাকায় সরিয়ে আনতে পারেননি, ফলে বিদেশে পড়তে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। যেসব দেশে ভিসা ছাড়া বাংলাদেশের নাগরিকরা প্রবেশ করতে পারত, সেই সব দেশের অধিকাংশই ভিসা ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে, বাকি অধিকাংশ দেশ ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে। আমেরিকা তো রীতিমতো ভিসার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে ইয়েমেন, আফগানিস্তান বা ফিলিস্তিন লেভেলে নেমে গেছে। দেড় বছরে ১৪ বার এবং প্রথম ১২ মাসে ১১ বার বিদেশসফর করলেও ‘ইউনূস ম্যাজিক’ কার্যত ফেইল করেছে।


ইউনূস শাসনামলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। বাংলাদেশে দুই প্রতিবেশী ভারত এবং মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের তিক্ততা বাড়তেই থাকে। পাঁচ আগস্টের পর ইউনূস এবং তার পরিষদরা সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় নানারকম ভারত বিরোধী কথাবার্তা বলে দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততার সৃষ্টি করেন। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, তার বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটা শেষ পর্যন্ত কৌতুকে পরিণত হয়।


পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে সব ধরনের অসম চুক্তি বাতিল করা হবে। কিন্তু দেড় বছরে ভারতের সাথে একটি চুক্তিও বাতিল করা হয়নি। জ্বালানি উপদেষ্টা আদানির চুক্তি বাতিলের কথা বললেও পরে এনিয়ে টু শব্দটি করেননি। গতবছরের ২৬ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত চারদিনের চীন সফর করেন অধ্যাপক ইউনূস। ২৮ মার্চ বেইজিংয়ের ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল’-এ চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক সংলাপে ড. ইউনূস বলেন, ‘নেপাল ও ভুটান স্থলবেষ্টিত দেশ, যাদের কোনো সমুদ্র নেই। ভারতের সাতটি উত্তরপূর্ব রাজ্যও স্থলবেষ্টিত। আমরাই এই অঞ্চলের জন্য সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক।’ সেভেন সিস্টার্স (উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য) নিয়ে করা তার মন্তব্যে ভারতের বিভিন্ন মহলে তোলপাড় শুরু হয়। তাদের কেউ ওই মন্তব্যকে বলেছেন ‘আক্রমণাত্মক’, কেউ বলেছেন ‘বিপজ্জনক’, কেউ কেউ ‘বিস্ময়’ ও ‘হতাশা’ প্রকাশ করেছেন। একটি দেশের সরকারপ্রধানের এধরনের মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা হয়। এসব দায়িত্বহীন কথাবার্তার ফলে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে দ্রুত।


এরফলে বাংলাদেশের পণ‍্যের জন্য বন্দর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ভারত। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হন। ৫ আগস্টের পর থেকেই ভারতের ভিসা কার্যত বন্ধ। মেডিক্যাল ভিসা চালু থাকলেও তা সহজলভ্য নয়। এই সময়ে সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠরা দেড় বছরে থেমে থেমে ভারত বিরোধী বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।


বাংলাদেশের ভেতরে ভারত বিরোধী প্রচারণা ছিল ইউনূস সরকারের পুরো শাসনামলে। গত বছরের ডিসেম্বরে এই সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। দুবার করে পরস্পরের কূটনীতিককে তলব করে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানায়। গত ২৩ ডিসেম্বর একই দিনে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে এবং দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই দিনে দুই দেশের দূতকে পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনা বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে এই প্রথম। ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ঘিরে এই সম্পর্কের অবনতির পেছনে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র ছিল বলে অনেকে মনে করেন। হাদির হত্যার ঘটনায় সম্প্রতি চিফ হুইপ এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ডিপ স্টেটের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেছেন।


ভারতের সাথে সম্পর্কের তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ভারতের অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করেনি। এরফলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতিতে বাংলাদেশের কোন লাভ হয়নি বরং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে বিশ্ব দরবারে।ভারত সুস্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেয়, তারা বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায়।


বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর প্রথম সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বাংলাদেশে ঝটিকা সফরে এসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে সমবেদনা জানান। এরপর ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরালা তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া মাত্র কয়েকদিনে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একাধিক শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান। শুধু তাই নয়, তিনি তারেক রহমানকে তার সুবিধামতো সময়ে ভারত সফরেরও আহ্বান জানান।


গত ২০ মার্চ ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর এবং শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী পিজুস গয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, গত বছরের এপ্রিলের পর বাংলাদেশি হাইকমিশনারের কোনো উচ্চপর্যায়ের ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে এটিই প্রথম সাক্ষাৎ। এ বৈঠক সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর তার এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) বলেন, ‘আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপরেই আমাদের আলোচনার মূল ফোকাস ছিল।’ 


পক্ষান্তরে রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, উভয় দেশের পারস্পরিক কল্যাণের জন্য বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। তিনি এবং পিজুস গয়াল দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীরতর করা, বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়া এবং অন্যান্য বাণিজ্য-সম্পর্কিত বিষয়ে কথা বলেন। গত ১ থেকে ৩ মার্চ বাংলাদেশের সেনা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশীদ ভারত সফর করেন। 


এরকম একটি সম্পর্ক পুনঃগঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভারত সফর।খলিলুর রহমান বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও দেখা হবে অজিত দোভাল, পীযূষ গোয়েল ও হারদীপ সিং পুরির সঙ্গে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরটি হতে যাচ্ছে টেকসই রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সফরের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিল্লির অবস্থান বুঝতে চাইবে ঢাকা। তেমনি দীর্ঘ মেয়াদে সম্পর্কের বিষয়ে বাংলাদেশের ভাবনা সম্পর্কে ভারতকে বার্তা দেওয়া হবে।


সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার থেকে ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশ জানতে ও বুঝতে চাইবে। পাশাপাশি শুধু বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই নয়, দীর্ঘ মেয়াদে পারস্পরিক মর্যাদা ও আস্থার ভিত্তিতে সম্পর্কটা এগিয়ে নিতে দুই দেশ যেন সচেষ্ট থাকে, সেই বার্তাও দেবে বাংলাদেশ।


ইরান যুদ্ধের পর বাংলাদেশের জন্য ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানি শুরু হয়েছে। সামনে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ভারত, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সমঝোতা জরুরি। আমরা অবশ্যই ভারতের অনুগত রাষ্ট্র হতে চাই না। আমরা চাই সমমর্যাদার ভিত্তিতে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তিক্ততা সৃষ্টি করে এখন বিশ্বে কোন সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমস্যা নিরসনে দরকার বন্ধুত্ব, আলাপ আলোচনা। আশার কথা, নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার সেই পথেই এগোচ্ছে।

Share on

Tags

(0) Comments

  • Nothing Found!

Add Comment