উত্তাল ইরান, বিক্ষোভে নিহত ১: ঐক্যের ডাক দিলেন পেজেশকিয়ান

Posted on January 01, 2026   8K

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর মুদ্রার রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ চতুর্থ দিনে আরও সহিংস রূপ নিয়েছেদেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরিস্তান প্রদেশে বিক্ষোভকারীদের সাথে সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য নিহত এবং অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের জনগণকে ‘শত্রু’র ষড়যন্ত্রের মুখে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি ‘পুরোদস্তুর যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, বিদেশের শত্রুরা অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে নতজানু করার চেষ্টা করছে। তবে দেশের অভ্যন্তরে সংহতি বজায় থাকলে কোনো শক্তিই ইরানকে পরাজিত করতে পারবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

গত রবিবার তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন অবমূল্যায়ন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। গত এক বছরে রিয়ালের মান প্রায় অর্ধেক কমেছে। বর্তমানে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ৫০ শতাংশের কোঠায়। লোরিস্তানের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলীয় ফারস প্রদেশেও ব্যাপক উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে একটি সরকারি ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষোভকে পুঁজি করে বিদেশি মদদপুষ্ট অশুভ চক্র দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে লোরিস্তানে নিহত ২১ বছর বয়সী বাসিজ ফোর্সের সদস্য আমির হোসাম খোদায়ারি ফার্দের মৃত্যুকে তারা ‘দাঙ্গাবাজদের সহিংসতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ইরানের বর্তমান এই অর্থনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর তেহরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সম্প্রতি ইউরোপীয় শক্তিগুলোও নতুন করে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের প্রক্রিয়া শুরু করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে মারাত্মক জ্বালানি ও পানি সংকট এবং রাজধানী তেহরানের চরম বায়ুদূষণ। এই বহুমুখী সংকটে জনমনে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। যদিও সরকার বলছে তারা বিক্ষোভকারীদের সাথে আলোচনার জন্য একটি ‘সংলাপ পদ্ধতি’ চালু করবে, তবে দেশটির শীর্ষ প্রসিকিউটর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রতিবাদের নামে কেউ জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করলে তাকে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নেয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ২০২২ সালে মাহসা আমিনি হত্যাকাণ্ডের পর ইরান যে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ দেখেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই স্মৃতিকেই উসকে দিচ্ছে। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি অবশ্য দাবি করেছেন, সরকার জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে প্রস্তুত এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার তারা স্বীকার করে। তবে সাধারণ ইরানিদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং রিয়ালের মান স্থিতিশীল করা। 

Share on

Tags

(0) Comments

  • Nothing Found!

Add Comment